বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়, সাইবার হামলা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে জরুরি পরিষেবা একযোগে ব্যাহত হলে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—তা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিপর্যয়ের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা জরুরি সেবা ও জনসাধারণের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা সচল রাখার ওপর।
বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একসঙ্গে অচল হয়ে পড়ার পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক স্কাই’ ইভেন্ট। তবে সরকারের বক্তব্য, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো হুমকির কারণে এই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে না। চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় আগাম পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরের আলো ও গরম রাখার ব্যবস্থার পাশাপাশি পানি সরবরাহ, ব্যাংকিং, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
ল্যাঙ্কাস্টারের অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০১৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ভয়াবহ বন্যার মধ্যে ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাস্টার শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। বন্ধ হয়ে পড়ে দোকানপাট, পেট্রল স্টেশন, অধিকাংশ এটিএম এবং ট্রাফিক সিগন্যাল। মোবাইল নেটওয়ার্কেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
বিদ্যুৎনির্ভর পাম্প অচল হয়ে পড়ায় পানি সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় তথ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে এফএম রেডিও এবং তামার তারের পুরোনো ল্যান্ডলাইন টেলিফোন।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রজার কেম্পের বর্ণনায়, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মানুষ মোবাইলের নেটওয়ার্ক ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য খুঁজতে থাকেন। একটি সচল টেলিফোন বুথের সামনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
ন্যাশনাল প্রিপেয়ার্ডনেস কমিশনের চেয়ারম্যান লর্ড হ্যারিসের মতে, বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু আলো নিভে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হলে জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
জরুরি তথ্য পৌঁছাতে বিবিসির বিকল্প ব্যবস্থা
বড় ধরনের বিপর্যয়ে মানুষের কাছে সরকারি নির্দেশনা পৌঁছাতে জরুরি সম্প্রচার পরিকল্পনা তৈরি করেছে বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ একটি রেডিও স্টুডিও থেকে সম্প্রচার চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। সেখানে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল নয়, এমন যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় জ্বালানি, খাবার ও পানি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এফএম রেডিওর মাধ্যমে জরুরি বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। সম্প্রচার অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে বিকল্প বিদ্যুৎ ও জেনারেটরের জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এসব সম্প্রচারে পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্যের পাশাপাশি পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি এবং পানি সরবরাহ বন্ধ থাকলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের তথ্য পাঠানোর জন্য স্যাটেলাইট ফোন ও স্যাটেলাইট-সুবিধাযুক্ত যানবাহন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যর্থ হলে আগে থেকে নির্ধারিত বিকল্প পদ্ধতিও অনুসরণ করা হবে।
বিকল্প মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগের উদ্যোগ
জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ সচল রাখতে উচ্চ আকাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে সক্ষম বিমানভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। হাই অল্টিটিউড সিউডো-স্যাটেলাইট বা এইচএপিএস নামে পরিচিত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সাময়িক মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে জরুরি পরিষেবার যোগাযোগব্যবস্থা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লর্ড হ্যারিস। তার আশঙ্কা, ব্যাপক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সের পারস্পরিক যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সরকারের বক্তব্য, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তিকে নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল রাখার বিষয়টি পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুরোনো ল্যান্ডলাইন বন্ধ নিয়েও উদ্বেগ
তামার তারের পুরোনো ল্যান্ডলাইন ব্যবস্থা থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তরের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পুরোনো ব্যবস্থায় কিছু টেলিফোন স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কাজ করতে পারত। ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিদ্যুৎনির্ভরতা বাড়ায় জরুরি সময়ে বিকল্প সংযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্ন উঠেছে।
অধ্যাপক রজার কেম্প মনে করেন, পুরোনো ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় মানুষ কীভাবে যোগাযোগ করবে, সে বিষয়ে কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা কার্যালয় জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎব্যবস্থা অত্যন্ত স্থিতিশীল। সরকারের প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো বিরল হলেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে তার প্রভাব কমিয়ে আনা এবং জরুরি সেবা চালু রাখা।
সূত্র: বিবিসি।
কমিউনিটির কথা বলে